পুজোর নামে পশুহত্যা কতোটা যুক্তিপূর্ণ
গীতার ১৭ তম অধ্যায়ে ভগবান বলেছেন,,
যারা শাস্র বিধি না মেনে ঘোর তপস্যা, পুজা করে
তারা হচ্ছে পাপি।
তাদের এমন পুজায় পুন্যের পরিবর্তে পাপ হয়।।
পরিতাপের বিষয় হলো, আমরা কল্পনা প্রসূত অলৌকিক গল্পকথা গুলোকেই ধর্ম সাধনায় স্থান দিয়েছি। তারপরও অসুবিধে ছিলো না, যদি বলি প্রথাটা চালু না হতো। বলি নেই এরকমও অনেক কাহিনী ধর্মে মধ্যে ঢুকে পড়েছে। অসুবিধা নেই, আস্তে আস্তে পরিশুদ্ধ হচ্ছে। এটাও হবে। শাস্ত্রে লক্ষ্য বলির কথা আছে। কিন্তু এই বলিতো সে বলি নয়। ধর্মে মানসিক হিংসাবোধকে বা মনের পশুকে বলি দিতে বলেছে। বনের পশুকে নয়। পারলে বাঘ বলি দিন। হাতি বলি দিন। অসুর ধরে বলি দিন। দেখি টাকার জোর ও ক্ষমতার জোর। নিরীহ পশুকে কেন? সর্বক্ষেত্রে নিরীহর উপর জুলুম। অথচ ধর্ম নিরীহদের রক্ষার কথা বার বার বলছে। দুষ্টুের দমন শিষ্টের পালন।
আগে ধর্ম কি বুঝতে হবে । শুধু শুধু তর্ক করলে হবে না। মূল শাস্ত্রের বাইরে গিয়ে কথা বললে হবে না। অল্প বিদ্যা ভয়ংকর, সমাজের কিছু পুরোহিতরা হলো সবচেয়ে বড় ভন্ড। বড় প্রতারক। তারা ধর্ম সম্বন্ধে জেনেও এক কোপে পাঠার মাথা কাটতে উদ্যত হয়। তাদের ধর্মটা মনে হয় ফতুয়া দিয়ে চলা। তাদের সম্পর্কে বলতে গেলে অনেক কথা বলা যায়।
সে সকল ভক্তরা জানে না সনাতন ধর্মে পশু বা প্রাণী হত্যা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। তারা বেদের নির্দেশ কে লঙ্ঘণ করার সাহস দেখায় এসকল গল্প কথার উপর ভিত্তি করে পাঠাবলি দিয়ে। মানব হিসেবে একবার চিন্তা করুণ। প্রাণী হত্যা করে সেটা দেবীর পুজা হয় কি করে?
দেবীর কি খাবারের অভাব পড়েছে,
যে পাঠার মাংসই তার খেতে হবে!
আমিতো জানি দেবদেবীরা সব নিরামিষ ভুজি।
পাপকে কেন আমি পূর্ণ বলে মনে করবো?
মাংসতো এমনিতে খায়। পবিত্র ধর্মের নামে খেতে হবে কেন?
মহাভারত তথা বেদে স্পষ্ট প্রাণী হত্যার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য রয়েছে -
সুরা মৎসা মধু মাংসমাসবং কৃসরোদনম্।
ধুর্তেঃ প্রবর্তিতং হোতন্নৈবদ্ বেদেষু কল্পিতম।।
(মহাঃ শান্তি পর্বঃ ২৬৫,শ্লোক ৯)
---সুরা, মৎস, মধু, মাংস, তাল রস, স্বাগু এইসব বস্তুকে ধুর্তরাই যজ্ঞে প্রচলিত করেছে। বেদে এসব উপযোগের বিধান নেই।
অব্যবস্থিতমর্যদৈবিমূঢর্নাস্তিকৈর্তবৈ।
সংশয়াত্মাভিরব্যক্তৈহিংসা সমনুবর্তিত।।
(মহাঃ শান্তি পর্বঃ অঃ ২৬৫, শ্লোক ৪)
--- যে ধর্মের মর্যাদা থেকে পথভ্রষ্ট হয়েছে মূর্খ- নাস্তিক তথা যার আত্মা সংশয় যুক্ত এবং যার কোন প্রসিদ্ধি নেই এইরূপ লোকই এটাকে সমর্থন করে।
মানান্মোহাচ্চ লোভাচ্চ লৌল্যমেত্যপ্রকল
্পিতম্।।
(মহাঃ শান্তি পর্ব, অঃ ২৬৫, শ্লোক ১০)
--- সেই ধূর্তরা মোহ এবং লোভের বশীভূত হয়ে সেই সব বস্তুর প্রতি আকর্ষণটা প্রকট করে থাকে।
যজ্ঞের মহিমা বর্ণনার জন্য পিতামহ ভীষ্ম যুধিষ্ঠির কে এক উপ্যাখান শোনান। উপাখ্যানটি মহাভারতের শান্তি পর্বের ২৭২ নং অধ্যায়ে এসেছে। সেই উপখ্যানে এক ব্রাহ্মণ যিনি কি না যজ্ঞে পশু বলি দেবার কথা চিন্তা মাত্রেই তার সমস্ত তপস্যা নষ্ট হয়ে গিয়েছিলো।
তস্য তেনামুভাবনো মৃগহিংমমসাত্মনস্তদা।
তপো মহৎসমুচ্ছিন্নং তস্মাদ্হিংসান যজ্ঞিয়া।।
(মহাঃ শান্তি পর্ব, অঃ২৭২, শ্লোক ১৮)
----আমি সেই পশু কে বধ করে স্বর্গলোক প্রাপ্ত করবো। এই ভেবে মৃগকে হিংসা করার জন্য উদ্যত সেই ব্রাহ্মণের মহান তপস্যা তৎক্ষণাৎ নষ্ট হয়ে গিয়েছে। এই জন্য হিংসা যজ্ঞের জন্য হিতকর নয়।
এই জন্য বেদ আমাদের সর্বদা হিংসাহিত কর্ম করার নির্দেশ দিয়েছেন। এবং আমাদের শরীর এবং দন্তের উপযোগী খাবার হিসেবে ডাল, ভাত সবজি ও ফল জাতীয় ইত্যাদি খাবারের অনুমোদন দিয়েছে।
ব্রীহিমন্নং যবমত্তমথো মাষমথো তিলম ।
এষ বাং ভাগো নিহিতো রত্নেধেয়ায় দন্তৌ মা হিংসিষ্ট পিতরং মাতরং চ।।
(অথর্ববেদ ৬।১৪০।২)
--- হে দন্ত! অন্ন খাও, যব খাও , মাষ কালাই এবং তিল খাও। তোমাকে এই উত্তম পদার্থ ধারনের জন্য স্থাপন করা হয়েছে। মাংসাহার থেকে দূরে থাকো।
এবং বেদ মন্ত্রে সেই পরমেশ্বরের কাছে প্রার্থনা করা হচ্ছে যে, আমাদের দন্ত যেন ব্যাঘের ন্যায় না হয়। কারন বাঘের দন্ত সর্বদা মাংসাহার করে থাকে। সে জন্য আমাদের দন্ত কে ব্যাঘের ন্যায় না করে কল্যাণকারী করো।
যৌ ব্যাঘ্রাববরূঢৌ জিঘত্সতঃ পিতরং মাতরং চ।
তৌ দন্ত ব্রহ্মণস্পতে শিবৌ কৃণু জাতবেদঃ।।
(অথর্ববেদ ৬।১৪০।১)
--- যে দন্ত ব্যাঘ্রের ন্যায় পিতা মাতাকেও খাওয়ার জন্য চেষ্টা করে, সেই দাঁতকে হে সর্বব্যাপক জ্ঞানের পরিপালক কল্যাণকারী করো।
অর্থাৎ বেদ আমাদের সর্বদাই কল্যাণকারী হওয়ার নির্দেশ দিচ্ছেন। যাতে করে আমাদের কাছ থেকে কেউ যেন কষ্ট না পায়। আমরা যেন নিরীহ প্রাণীদের হিংসা না করি। হত্যা না করি। কারন, অহিংসাই পরম ধর্ম। জীব হত্যা মহা পাপ। নিরীহ জীব হত্যা আরো মহাপাপ (মহাঃ আদিঃ অঃ ১১, শ্লোঃ ১৩) এবং "হিংসা অধর্মস্তথহিত" (মহাঃ শান্তিঃ ২৭২, শ্লোক ১৮) হিংসা অধর্ম এবং অহিতকর।
"প্রাণিনামবধস্তাত সর্বজায়ান্" (মহাঃ কর্ণ পর্ব, অঃ ২৬৯, শ্লোক ২৩) অর্থাৎ প্রাণীদের বধ না করাই শ্রেষ্ঠ ধর্ম।
জীবিতুং যঃ স্বযং চেচ্ছেত্ কথং সোন্যং প্রঘাতয়েত।
যদ যদাৎমসি চেচ্ছেত তত পরস্যাপি চিন্তয়েত।।
(মহাঃ শান্তি পর্ব, অঃ ২৫৯, শ্লোক ২২)
উপরিউক্ত মন্ত্রগুলি দ্বারা এটা স্পষ্ট যে, বেদের কোনো নির্দোষ পশুকে হত্যার উপদেশ করেনি। বরং উপদেশ করেছে, পশুস্ত্রাঁয়েথাঙ (যজুর্বেদ ৬।১১) অর্থাৎ পশুদের রক্ষা করো এবং তাদের বর্ধিত করো। কারন বেদ সর্বদাই কল্যাণময়।
এবার আপনারাই বিবেচনা করুন যে কোনো অবস্থাতেই বলি বা পশু হত্যা করা উচিত কি না।
আপনাদের কাছে কি ঈশ্বরকে অবিবেচক মনে হয়?
তিনি এক জায়গায় বলবে প্রাণী হত্যা নিষেধ, আরেক জায়গায় দেবীর জন্য বলি দেয়া জায়েজ করে দেবেন?
সবাই বুঝতে চেষ্টা করুন, সনাতন ধর্মের প্রকৃত স্বরূপ সম্বন্ধে। সবাইকে সচেতন করতে পারলেই এসব ঘৃণ্য বলি প্রথা থেকে সনাতন ধর্মাবলম্বিদের মুক্ত করা যাবে।
শেয়ার করুন সকলে জানার জন্য।